১৫ই আগস্ট। ভারতের স্বাধীনতা দিবস। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্বাধীনতার সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে — অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, স্বপ্ন, লড়াই এবং একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসে। ১৯৪৭-এর সেই মধ্যরাত থেকে ৭৯ বছর পেরিয়ে ভারত আজ এক ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের অবস্থানে এসেছে বড় পরিবর্তন। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশাও।
কিন্তু স্বাধীনতা দিবস কি শুধু অতীতকে স্মরণ করার দিন?
সম্ভবত নয়। এই দিনটি আমাদের নিজেদের কাছেও কিছু প্রশ্ন রাখে। যে ভারতকে সামনে রেখে স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছিল, সেই ভারতের কতটা আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি? আর আগামী প্রজন্মের হাতে আমরা কেমন ভারত তুলে দিতে চাই?
আজকের ভারতকে বুঝতে গেলে এই প্রশ্নগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে দেশ এগিয়েছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কৃষকের অনিশ্চয়তা, শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। তাই স্বাধীনতার অর্থকে শুধু জাতীয় গৌরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের মর্যাদা, সমান সুযোগ, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা প্রয়োজন।
আর এখানেই স্বাধীনতার সঙ্গে সংবিধানের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য এবং ব্যক্তির মর্যাদার যে আদর্শ সামনে রাখে, তা স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে আরও বিস্তৃত করে। স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি নয়; স্বাধীনতা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকারও, যেখানে নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগকে মূল্য দেওয়া হয়। সংবিধানের মৌলিক কর্তব্যগুলিও নাগরিককে স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শকে ধারণ করা, সম্প্রীতি রক্ষা করা, বৈজ্ঞানিক মনন ও মানবতাবোধ গড়ে তোলার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দায়িত্বের জায়গাতেই নতুন প্রজন্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের জেন জ়ি এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যখন তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের প্রাচুর্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও বা একটি পোস্ট অনেক সময় দীর্ঘ ইতিহাসের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে। অ্যালগরিদমও আমাদের সামনে এমন তথ্য বেশি তুলে ধরে, যা অনেক সময় আমাদের আগের ধারণার সঙ্গে মেলে। ফলে মতের বৈচিত্র্যের বদলে তৈরি হতে পারে নিজস্ব মতের গণ্ডি। এর প্রভাব ইতিহাসের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্র, গান্ধী-নেতাজি, নেহরু-পেটেল — অনেক সময় তাঁদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন একজনকে সম্মান করতে হলে অন্যজনকে অস্বীকার করতেই হবে। অথচ ইতিহাস এত সরল নয়।
ভারতের স্বাধীনতা কোনও এক ব্যক্তি, একটি মতাদর্শ বা একটি রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব ছিল না। স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল বহু ধারার, বহু মানুষের এবং বহু মতের সম্মিলিত ইতিহাস। গান্ধীর অহিংস আন্দোলন, নেতাজির সশস্ত্র সংগ্রামের প্রচেষ্টা, সর্দার পেটেলের রাজনৈতিক সংহতির ভূমিকা এবং নেহরুর আধুনিক ভারতের স্বপ্ন — স্বাধীনতা ও স্বাধীন ভারত নির্মাণের ইতিহাসে প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। একইভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবোধ এবং রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ভারতীয় চিন্তাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
তাই ইতিহাসে কাউকে বড় করতে গিয়ে অন্য কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। বরং ইতিহাসের ভিন্ন মত, মতপার্থক্য ও জটিলতাকে বোঝার মধ্যেই প্রকৃত ইতিহাসচেতনা তৈরি হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ইতিহাসকে অনেক সময় সেই জায়গায় রাখা হচ্ছে না। ইতিহাসকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার করা হচ্ছে। একজনকে বড় করতে অন্যজনকে ছোট করা, একটি সম্প্রদায়ের গৌরব প্রতিষ্ঠা করতে অন্য সম্প্রদায়ের অবদানকে অস্বীকার করা, অতীতের জটিলতাকে সরল ‘আমরা বনাম তারা’-র গল্পে পরিণত করা — এই প্রবণতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। ইতিহাস যদি রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। আর ইতিহাস যদি প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখায়, তাহলে সেটিই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু শুধু তাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ তারা যে সময়ের মধ্যে বড় হচ্ছে, সেই সময়ের রাজনৈতিক ভাষা, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষা এবং গণমাধ্যমও তাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। তাদের সামনে বিকৃত ইতিহাসের পরিবর্তে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। আমরা যদি তাদের হাতে বিভাজন ও ঘৃণার ইতিহাস তুলে দিই, তার দায় আমাদেরও। আর যদি যুক্তিবোধ, সঠিক ইতিহাস, সহিষ্ণুতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ তুলে দিতে পারি, তাহলে তাদের হাতেই আরও শক্তিশালী ও পরিণত ভারত গড়ে উঠতে পারে।
অখণ্ডতার অর্থও তাই শুধু দেশের ভৌগোলিক সীমানা অটুট রাখা নয়। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী ও অখণ্ড থাকে, যখন তার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং নিরাপত্তাবোধ থাকে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই ভারতের পরিচয়। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অঞ্চল এবং রাজনৈতিক মতের এত পার্থক্য সত্ত্বেও একসঙ্গে থাকার ক্ষমতাই আমাদের অন্যতম বড় শক্তি।
গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশকে ভালোবাসা মানে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। সরকারের প্রশংসা করার যেমন অধিকার আছে, তেমনই তার সমালোচনা করার অধিকারও নাগরিকের রয়েছে। প্রশ্ন করা, মত প্রকাশ করা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়; বরং তার শক্তি। একটি পরিণত গণতন্ত্রে দেশপ্রেমের জায়গা যেমন থাকে, তেমনই থাকে প্রশ্ন করার জায়গা। সেখানে মতের পার্থক্য শত্রুতায় পরিণত হয় না। রাজনৈতিক বিরোধিতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ নেয় না। নাগরিকের অধিকার দল, ধর্ম, ভাষা বা মতাদর্শের ভিত্তিতে বদলে যায় না।
জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতার ইতিহাস স্মরণ করব, জাতীয় সংগীত গাইব, দেশের অগ্রগতি নিয়ে গর্ব করব। এগুলি আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কিন্তু তার পাশাপাশি যদি নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রাখি — আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন ভারত রেখে যাচ্ছি — তাহলেই স্বাধীনতা দিবসের আত্মসমীক্ষা সম্পূর্ণ হবে।
আমরা কি এমন একটি ভারত রেখে যেতে চাই, যেখানে ইতিহাস রাজনৈতিক বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে? যেখানে ভিন্নমত মানেই বিরোধিতা বা শত্রুতা? যেখানে সামাজিক পরিচয় নাগরিকের মর্যাদার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে? নাকি এমন একটি ভারত, যেখানে মতের পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে, তীব্র মতবিরোধও থাকবে — কিন্তু নাগরিকের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার থাকবে সবার জন্য সমান?
জাতীয় পতাকার তিনটি রং যেমন পাশাপাশি থেকেই পতাকাকে পূর্ণতা দেয়, তেমনই ভারতের বৈচিত্র্যই আমাদের জাতীয় পরিচয়কে পূর্ণ করে। ঐক্য মানে একরকম হয়ে যাওয়া নয়; ভিন্নতাকে সঙ্গে নিয়েই একসঙ্গে চলতে পারা।
স্বাধীনতার ৭৯ বছর পূর্ণ হওয়ার এই মুহূর্তে তাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়। সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা, যেখানে ভারত হবে আরও ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল এবং মানবিক। কারণ স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয় — এটি একটি চলমান দায়িত্ব।
সেই দায়িত্ব কোনও এক প্রজন্মের নয়, কোনও এক রাজনৈতিক দলের নয়, কোনও এক সম্প্রদায়েরও নয়। সেই দায়িত্ব আমাদের সকলের।
জয় হিন্দ